বিতর্কিত দুই ইসলামিক বক্তাকে ভিসা দেওয়ায় সরকারের সমালোচনা। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ এপ্রিল- দুই বিতর্কিত ইসলামিক বক্তাকে ভিসা দেওয়ার ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী এন্থনি আলবানিজ নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার এবার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, যথাযথ নিরাপত্তা যাচাই ছাড়া তাদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

চরমপন্থার অভিযোগ থাকা দুই ব্যক্তিকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ায় সমালোচনার মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক। ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক-এর দপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পূর্বে বিতর্কিত বক্তব্য ও ঘৃণামূলক মন্তব্যের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও দুই বক্তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তারা ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি ও ক্যানবেরায় বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল।
এই দুই বক্তার একজন মিজানুর রহমান আজহারী, যিনি অতীতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, তাকে গত সপ্তাহে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তার অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে শায়খ আব্দুল্লাহ’র ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তিনি তার আগেই দেশ ত্যাগ করেন। জানা গেছে, তিনি ও আজহারী একই সফরের অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন।
অস্ট্রেলিয়া-ইসরায়েল ও জিউইশ অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের কর্মকর্তা জোএল বুৰণিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে এমন দুই ব্যক্তি ভিসা পেতে সক্ষম হলেন।
তিনি বলেন, “সরকার একদিকে বলছে তারা ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এমন ব্যক্তিরা সহজেই দেশে ঢুকে পড়ছে। মনে হচ্ছে শুরুতেই কোনো কার্যকর যাচাই ব্যবস্থাই ছিল না।”
সমালোচকরা বলছেন, সাধারণ অনলাইন অনুসন্ধানেই তাদের অতীত বিতর্কিত বক্তব্য পাওয়া যেত, যা গণমাধ্যম ও কমিউনিটি সদস্যরা ইতোমধ্যে তুলে ধরেছিলেন।
এই ঘটনায় ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ও অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেছেন। ক্রিস কেননি সরকারের প্রতি আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “শুধু ভিসা বাতিল করলেই হবে না, সমাজে যারা ঘৃণা ছড়াতে চায় তাদের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে।”
এদিকে এই দুই বক্তার সফরের আয়োজন করেছিল Islamic Practice and Dawah Circle (IPDC)। তাদের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ এর ৬ এপ্রিলের প্রিন্ট সংস্করণে প্রকাশিত এন্ড্রু বোল্ট-এর এক মতামত নিবন্ধে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
লেখকের মতে, সিডনির বন্ডাই এলাকায় ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর হামলার মাত্র চার মাসের মধ্যেই এন্থনি আলবানিজ সরকারের সরকারের পক্ষ থেকে এমন দুইজন মুসলিম বক্তাকে ভিসা দেওয়া হয়েছে, যারা ইহুদিবিরোধী বক্তব্য দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, একজনকে ভিসা দেওয়া ভুল হতে পারে, কিন্তু দু’জন হলে তা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত।
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি মৌলবাদী ইসলামিক বক্তা মিজানুর রহমান আজহারিকে হিটলার প্রশংসার অভিযোগে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। আজহারি অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন, মেলবোর্ন, সিডনি ও ক্যানবেরায় ‘লেগ্যাসি অফ ফেইথ’ সিরিজের বক্তৃতা দিতে আসেন।
লিবারাল সেনেটর জোনাথান ডুনিয়াম বলেছেন, সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভিন্ন সংস্থা এবং সংসদ সদস্যদের আজহারির আগমনের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি হিটলারের প্রশংসা করেছিলেন, ইহুদিদের অবমাননা করেছিলেন এবং শ্রোতাদের তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বক্তৃতায় তিনি হিটলারের জঘন্য আচরণে আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
ডুনিয়াম আরও বলেন, “আজহারির বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধ নয়। তার বক্তৃতায় ইহুদিবিরোধী, হিন্দুবিরোধী বক্তব্য এবং বাঙালি সংস্কৃতির অবমাননার প্রমাণ রয়েছে। তবুও অস্ট্রেলিয়া সরকার তাকে দেশে প্রবেশ করতে অনুমতি দিয়েছে।”
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় সংস্থাগুলি সপ্তাহের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তাদের কাছে হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছিল। তারা সতর্ক করেছিলেন, আজহারির বক্তৃতা ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং উগ্রবাদকে বৈধতা দিতে পারে।
দৈনিক মেইল জানিয়েছে, বক্তৃতা সফরের আয়োজনকারী সংস্থা ইসলামিক প্র্যাকটিস ও দাওয়াহ সার্কেলের সঙ্গে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হয়েছে, তবে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সমালোচকদের মতে, এই ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। সরকারকে এখন শুধু প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, বরং আগেভাগেই কঠোর যাচাই ও নজরদারি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।